ধাতু কাকে বলে? ধাতু ও ক্রিয়াপদের পার্থক্য কি?

ধাতু কাকে বলে?

ক্রিয়াপদের মূল বা অবিভাজ্য অংশ, যাকে ভাঙা যায় না, যা বিশ্লেষণও করা যায় না, এমন মৌলিক শব্দকে ধাতু বা ক্রিয়ামূল বলে। যেমন— রাজু ভাত খাবে। আমি বই পড়ি। সে লিখে।

ওপরের উদাহরণগুলোতে খাবে, পড়ি, লিখে ইত্যাদি ক্রিয়াপদ। এখানে খাবে, পড়ি, লিখে— এ তিনটি ক্রিয়াপদকে বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই যথাক্রমে— খা + বে, পড় + ই, লিখ্‌ + এ ইত্যাদি। এখানে খা, পড়, লিখ এ তিনটি মূল অংশকে আর ভাঙা যাবে না। এগুলোই ক্রিয়ামূল বা ধাতু। বে, ই, এ ইত্যাদি ক্রিয়া বিভক্তি। উদাহরণের ক্রিয়াপদগুলো লক্ষ্য করলে বুঝা যায় যে, ক্রিয়ামূল বা ধাতুর সাথে ক্রিয়া বিভক্তি যোগ হয়ে ক্রিয়াপদ গঠিত হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ক্রিয়াপদকে বিশ্লেষণ করলে যে মূল অংশ পাওয়া যায় তা-ই ধাতু বা ক্রিয়ামূল।

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “ক্রিয়ার মূল অর্থ যাতে নিহিত, যার দ্বারা ক্রিয়ার ভাবটি প্রতিপাদিত হয়, তাকে বলে ক্রিয়ার ধাতু (Verb-root) অর্থাৎ কোন ক্রিয়াপদকে বিশ্লেষণ করলে বা ভাঙলে, শেষ পর্যন্ত এমন একটি মূল বা জড় পাওয়া যায়, যাকে আর বিশ্লেষণ বা ভাগ করা সম্ভব নয়, যার দ্বারা ক্রিয়াপদের অন্তর্নিহিত অর্থ বা ভাবটি মাত্র প্রকাশ পায়, ক্রিয়াপদের এই অবিভাজ্য জড়, এই মূলকে বলে সেই ক্রিয়ার ধাতু।”

ক্রিয়ার মূল বা ধাতুকে চিনবার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মধ্যম পুরুষের তুচ্ছার্থক তুই তোরা পদের সাথে বর্তমান কালের অনুজ্ঞায় যে কোন ক্রিয়া ব্যবহার করে আদেশ সূচক কথা বলা। কেননা, বর্তমানকালের অনুজ্ঞায় তুই/তোরা পদের সাথে সরাসরি ক্রিয়ার মূল ধাতুই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন- তুই যা, তোরা যা, তুই খা, তোরা খা ইত্যাদি। এখানে যাওয়া, খাওয়া প্রভৃতি ক্রিয়ার মূল বা ধাতু হলো √যা, √খা ইত্যাদি। ক্রিয়ামূল বা ধাতু বোঝাবার জন্য √ এই চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।

 

ধাতুর প্রকারভেদ

উৎপত্তি ও গঠনপ্রকৃতি অনুসারে ধাতু প্রধানত চার প্রকার। যথা—

১। মৌলিক বা সিদ্ধ ধাতু

২। সাধিত ধাতু

৩। যৌগিক ধাতু

৪। সংযোগমূলক ধাতু।

১। মৌলিক বা সিদ্ধ ধাতু : যে সকল ধাতু স্বয়ংসিদ্ধ অর্থাৎ যে সকল ধাতুকে ব্যাকরণগত প্রক্রিয়ায় আর বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়, তাদেরকে মৌলিক বা সিদ্ধ ধাতু বলে। মৌলিক ধাতুকে স্বয়ংসিদ্ধ ধাতু বলা হয়। যেমন— কর, দেখ, বল, চল, পড়, ডাক, হাস, নাচ, পা, খা, নে, দে, আন, হ, শোন, যা ইত্যাদি।

বাংলা ভাষায় মৌলিক ধাতুকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যথা:

(ক) খাঁটি বাংলা ধাতু, (খ) সংস্কৃত মূল ধাতু ও (গ) বিদেশি ধাতু।

(ক) খাঁটি বাংলা ধাতু : যে ধাতুগুলো সংস্কৃত থেকে সরাসরি না এসে প্রাকৃত, অপভ্রংশ বা স্বতন্ত্রভাবে বাংলা ভাষায় এসেছে, সেগুলোকে খাঁটি বাংলা ধাতু বলে। এসব ধাতুকে ভিত্তি করে ক্রিয়াপদ, কৃদন্ত বিশেষ্য এবং কৃদন্ত বিশেষণ গঠিত হয়। যেমন : কাট্ – কাটা, কাঁদ – কাঁদা, নাচ – নাচা ইত্যাদি।

(খ) সংস্কৃত মূল ধাতু : যেসব ধাতু সংস্কৃত মূল থেকে সরাসরি বাংলা ভাষায় এসেছে, সেগুলোকে সংস্কৃত মূল ধাতু বলে। অর্থাৎ সংস্কৃত বা তৎসম ক্রিয়াপদের ধাতুই সংস্কৃত মূল ধাতু। যেমন— অঙ্ক, গঠ, চব্ ইত্যাদি।

(গ) বিদেশি ধাতু : বিদেশি ভাষা থেকে যেসব ধাতু বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে, সেগুলোকে বিদেশি ধাতু বলে। যেমন– আট্, জম্, ঝুল্, টান্, টুন্, ডর্ ইত্যাদি।

২। সাধিত ধাতু : মৌলিক বা সিদ্ধ ধাতুর সাথে ‘আ’ প্রত্যয় যোগে যে সকল ধাতু গঠিত হয়, তাদেরকে সাধিত ধাতু বলে। সাধিত ধাতুকে যদি বিশ্লেষণ করা হয় তবে মূল ধাতু ও প্রত্যয় পাওয়া যায়। যেমন— দেখা = (দেখ + আ), করা = (কর + আ), চলা = (চল + আ), বলা = (বল + আ), হাসা = (হাস + আ), নাচা = (নাচ + আ), পড়া = (পড়ু + আ) ইত্যাদি।

গঠনরীতি ও অর্থের দিক থেকে সাধিত ধাতু আবার চার ভাগে বিভক্ত। যথা : (ক) নাম ধাতু, (খ) প্রযোজক বা ণিজন্ত ধাতু (গ) ধ্বন্যাত্মক ধাতু ও (ঘ) কর্মবাচ্যের ধাতু।

(ক) নাম ধাতু : বিশেষ্য, বিশেষণ ও অব্যয়— এই নাম পদগুলোর পরে ‘আ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে নতুন ধাতু গঠিত হয়, তাকে নাম ধাতু বলে। যেমন— উত্তর + আ + ইল = উত্তরিল, দান + আ + ইলা = দানিলা, চাবুক + আ = চাবুকা ইত্যাদি।

(খ) প্রযোজক বা নিজন্ত ধাতু : মৌলিক ধাতুর পরে নিচ্ প্রত্যয় (প্রেরণার্থে) যুক্ত হয়ে যে ধাতু গঠিত হয়, তাকে প্রযোজক বা নিজন্ত ধাতু বলা হয়। মোটকথা, প্রযোজক ক্রিয়ার মূল বা ধাতুকে প্রযোজক ধাতু বলে। বাংলা ‘আ’ বা ‘ওয়া’ হলো নিচ প্রত্যয়। যেমন- পড়ু + আ = পড়া, যা + আ = যাওয়া, বল + আ = বলা, খা + আ = খাওয়া ইত্যাদি।

(গ) ধ্বন্যাত্মক ধাতু : ধ্বন্যাত্মক অব্যয় বা অনুকার শব্দের সাথে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে ধাতুরূপ গঠিত হয়, তাকে ধ্বন্যাত্মক ধাতু বলে। যেমন–

 

  • হনহন্ + আ = হনহনা : লোকটি হনহনিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
  • টগবগ + আ = টগবগা : টগবগিয়ে ঘোড়া চলছে।
  • কলকল + আ কলকলা : কলকলিয়ে পানি পড়ছে।

 

(ঘ) কর্মবাচ্যের ধাতু : কর্মবাচ্যের ক্রিয়া কর্ম অনুসারে গঠিত হয়। সিদ্ধ বা মৌলিক ধাতুর সাথে ‘আ’ প্রত্যয় যোগে কর্মবাচ্যের ধাতু গঠিত হয়। পরে কর্মবাচ্যের ধাতুর সাথে ক্রিয়া বিভক্তি যুক্ত হয়ে কর্মবাচ্যের ক্রিয়া গঠিত হয়। যেমন— দেখ + আ = দেখা, শুন + আ = শুনা, মান + আ = মানা, বিক + আ = বিকা ইত্যাদি।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

You cannot copy content of this page