ফসল কি? মাঠ ফসল ও উদ্যান ফসল কাকে বলে?

আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন সবাই? আশা করছি সবাই ভালো আছেন। আজকে আমরা আলোচনা করবো ফসল কি?; ফসল কত প্রকার ও কি কি?; তো চলুন জেনে নেই।

ফসল কি?

মানুষ তার প্রয়োজনে যে সব উদ্ভিদ উৎপাদন করে থাকে অর্থাৎ অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদগুলিকে আমরা ফসল বলে থাকি।

 

ফসলের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Crop)

১। মাঠ ফসল এবং

২। উদ্যান ফসল।

মাঠ ফসল কাকে বলে? (What is called Field Crops in Bengali/Bangla?)

যেসব ফসল বিস্তীর্ণ মাঠে বেড়াহীন অবস্থায় উৎপাদন করা হয় তাকে মাঠ ফসল (Field Crops) বলে। মাঠ ফসলকে কৃষি তাত্ত্বিক ফসলও বলে। যেমন– ধান, গম, ভুট্টা, আখ ইত্যাদি। দেশের মোট আবাদি জমির শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ জমিতে মাঠ ফসলের চাষ হয়।

বাংলাদেশে মানুষের শর্করা জাতীয় খাদ্যের অধিকাংশ পূরণ হয় দানাজাতীয় ফসল তথা মাঠ ফসল হতে। মাঠ ফসলের মধ্যে ধান অন্যতম। মাঠ ফসলের মধ্যে ৮০% জমিতেই ধানের চাষ হয়। ধানের পরেই গমের স্থান। পৃথিবীর সকল দেশের প্রধান খাদ্য হিসাবে ধান, গম, ভুট্টা ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে আশ জাতীয় ফসলের মধ্যে তুলা, তেলজাতীয় ফসলের মধ্যে সরিষা, ডাল ফসলের মধ্যে মসুর ও মুগ, চিনি উৎপাদনে আখ অন্যতম। প্রধান অর্থকরী বা বাণিজ্যিক ফসল হচ্ছে পাট। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (BJRI) বেশ কয়েকটি পাটের জীবন রহস্য উন্মোচন করেছে।

গম হতে আটা, ময়দা, সুজি ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করা হয়। ভুট্টা খাদ্যশস্য ও পশুখাদ্য উভয় হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ডালকে গরিবের মাংস বলা হয় কারণ ডালে প্রচুর পরিমাণ আমিষ বিদ্যমান থাকে। ডালজাতীয় ফসলের চাষে জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়। আঁশ জাতীয় ফসল বস্ত্রশিল্পের প্রধান উৎস। তেলজাতীয় ফসলের তেল বীজ হতে খৈল উৎপাদন করা যায়, যা গবাদি পশুর খাদ্য। খৈল জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও ব্যবহৃত হয়। মোম, সাবান তৈরিতে নানাপ্রকার তেল ব্যবহৃত হয়। আমরা এখন মাঠ ফসলের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।

 

মাঠ ফসলের বৈশিষ্ট্য কি কি? (What are the properties of Field Crops?)

নিচে মাঠ ফসলের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো–

  • মাঠের সমস্ত ফসলকে একসাথে বা সমষ্টিগতভাবে যত্ন নেওয়া যায়।
  • অন্যান্য ফসলের তুলনায় কম যত্নের প্রয়োজন হয়।
  • সাধারণত বড় জমিতে একত্রে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়।
  • মাঠ ফসলের জমিতে বেড়া দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
  • সমস্ত মাঠের ফসল একসাথে কর্তন বা সংগ্রহ করা হয়।
  • মাঠ ফসলের বীজ সাধারণত ছিটিয়ে বপন করা হয়।
  • একবর্ষজীবী ফসল।
  • নিচু ও মাঝারি নিচু জমিতে চাষ করা যায়।
  • উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ করা যায়।
  • ফসল সংগ্রহ করার পর সাধারণত শুকিয়ে ব্যবহার করা হয়।
  • উৎপাদন ব্যয় কম।

 

মাঠ ফসলের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Field Crops)

ব্যবহারের ভিত্তিতে মাঠ ফসলকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন-

১. দানাদার ফসল : গ্রামীণ পরিবারভুক্ত যেসব ফসলের বীজ খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ : ধান, গম, ভুট্টা, যব, কাউন, বার্লি, জোয়ার ইত্যাদ।

২. ডাল ফসল : শিম জাতীয় যেসব ফসলের বীজ ডাল খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ : মসুর, মাসকালাই, মুগ, মটর, খেসারি, ছোলা, আড়হর, ফেলন ইত্যাদি।

৩. তেলবীজ ফসল : যেসব ফসলের বীজ হতে তেল সংগ্রহ করা হয়। উদাহরণ : সয়াবিন, সরিষা, তিসি, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, কুসুমফুল, গর্জন, তিল, রাই, ইত্যাদি।

৪. আাশঁ জাতীয় ফসল : যেসব ফসল হতে আশ পাওয়া যায়। উদাহরণ : পাট, তুলা, মেস্তা, কেনাফ ইত্যাদি।

৫. চিনি উৎপাদক ফসল : যেসব ফসল হতে চিনি ও গুড় উৎপাদন করা হয়। উদাহরণ : আখ, খেজুর, সুগারবিট, তাল ইত্যাদি।

৬. পানীয় ফসল : যেসব ফসল হতে পানীয় দ্রব্য উৎপাদন করা হয়। উদাহরণ : চা, কফি ইত্যাদি।

৭. গোখাদ্য ফসল : যেসব ফসল বা ফসলের কোনো অংশ পশুখাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ : ভুট্টা, ফেলন, দূর্বাঘাস, প্যারা ঘাস, নেপিয়ার ঘাস, জার্মান ঘাস, গো মটর, কাউপি ইত্যাদি।

৮. সবুজ সার ফসল : জমিতে সবুজ সার উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ : ধৈঞ্চা, কাউন, শণপাট, মাসকলাই, ইপিল ইপিল, বরবটি।

৯. নেশাজাতীয় ফসল : যেসব ফসল নেশাজাতীয় পদার্থ উৎপন্ন করার জন্য চাষ করা হয়। উদাহরণ : তামাক, গাঁজা, আফিম, পান, পপি ইত্যাদি।

১০. ঔষধি ফসল : ঔষধ হিসাবে ব্যবহারের জন্য যেসব ফসল উৎপাদন করা হয়। উদাহরণ : তুলসি, বাসক, নিশিন্দা, কালোমেঘ, ঘৃতকাঞ্চন ইত্যাদি।

 

উদ্যান ফসল কাকে বলে? (What is called Horticultural crop in Bengali/Bangla?)

জমিতে বেড়া দিয়ে অর্থাৎ নিবির পরিচর্যার মাধ্যমে যেসব ফসল চাষ করা হয় সেগুলোকে উদ্যান ফসল বলে। যেমন- টমেটো, চিচিঙ্গা, লাউ, শিম, বেগুন, আদা, হলুদ, গোলাপ, রজনীগন্ধা, মরিচ, পেঁপে, আনারস ইত্যাদি।

 

উদ্যান ফসলের বৈশিষ্ট্য কি কি? ( What are the characteristics of Horticultural crop?)

  • সাধারণত প্রতিটি গাছের আলাদাভাবে যত্ন নেওয়া হয়। (ব্যতিক্রম— পিঁয়াজ, রসুন, শাক, মসলা)
  • তুলনামূলক বেশি যত্নের প্রয়োজন হয়।
  • সাধারণত অল্প জমিতে চাষ করা হয়।
  • বেড়া নির্মাণের প্রয়োজন হয়।
  • ফসল ধাপে ধাপে পরিপক্ক হয় এবং সংগ্রহ করতে হয়। (ব্যতিক্রম- আলু, পিঁয়াজ, মসলা)
  • উদ্যান ফসলের বীজ সাধারণত সারিতে বপন বা রোপণ করা হয়।
  • একবর্ষজীবী, দ্বিবর্ষজীবী ও বহুবর্ষজীবী হয়।
  • উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে চাষ হয়।
  • সকল ফসল সংরক্ষণ করা যায় না।
  • সাধারণত তাজা ও রসালো অবস্থায় ব্যবহৃত হয়। (ব্যতিক্রম- লবঙ্গ, জিরা, কলোজিরা, তেজপাতা)
  • উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হয়।
  • নিবিড় পরিচর্যা করতে হয়।
  • সাধারণত বাড়ির আশেপাশে অল্পজমিতে চাষ করা হয়। (ব্যতিক্রম— গোলআলু, মিষ্টি আলু)।

 

উদ্যান ফসলের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Horticultural crop)

উদ্যান ফসল বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে :

১. শাকসবজি জাতীয় ফসল : বাংলাদেশে প্রায় ৫০ রকমের শাকসবজি চাষ করা হয়। যেমন- পটল, পালংশাক, বেগুন, টমেটো, ডাঁটা, শিম, করলা, পুঁইশাক, আলু, লাউ, কচু, ফুলকপি ইত্যাদি।

২. ফলজাতীয় ফসল : বাংলাদেশে প্রায় ৭০ রকমের ফল চাষ করা হয়।

  • প্রচলিত ফল : কলা, আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, পেঁপে, লেবু, বাতাবি লেবু, লিচু, কুল, নারিকেল ইত্যাদি।
  • অপ্রচলিত ফল : কামরাঙা, লটকন, সাতকরা, আতা, শরিফা, জলপাই, বেল, আমড়া, কদবেল, আমলকী, জাম, ডালিম, সফেদা, জামরুল, গোলাপজাম ইত্যাদি।

৩. ফুলজাতীয় ফসল : বাংলাদেশে প্রায় ৩০ রকমের ফুল চাষ করা হয়। যেমন- গোলাপ, রজনীগন্ধা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাস ইত্যাদি

৪. মসলাজাতীয় ফসল : বাংলাদেশে প্রায় ১৪ রকমের মসলা চাষ করা হয়। যেমন- পিঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, মরিচ ইত্যাদি

 

অনুশীলনী

১। উদ্যান শব্দের অর্থ কি?

উত্তর : উদ্যান শব্দের অর্থ বাগান বা বাগিচা।

 

২। মাঠ ফসলের বহুমুখীকরণ বলতে কী বোঝ?

উত্তর : মাঠ ফসলের বহুমুখীকরণ বলতে এক ধরনের ফসল বা একক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে ফসল বিন্যাস, মিশ্র ও সাথি ফসলের চাষ ও খামার যান্ত্রিকীকরণকে বোঝায়। ফসলের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে উন্নত ফসলের জাত ও কলাকৌশলের সংযোগ ঘটিয়ে বীজের সাশ্রয় করা হয় এবং উৎপাদন খরচ কমানো হয়।

 

ফসল কি? মাঠ ফসল ও উদ্যান ফসল কাকে বলে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top